ঢাকা ১২:২২ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৯ মে ২০২৩, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩০ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ ::
লালমনিরহাটে চাউলের বস্তায় মিললো ৩৮ লাখ টাকা কালীগঞ্জে বঙ্গবন্ধুর জুলিও কুরি শান্তি পদক প্রাপ্তির ৫০ বছর উদযাপন শিক্ষার্থীরাই স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মানের কারিগর -হুইপ ইকবালুর রহিম এমপি দোয়ারাবাজারে বীরমুক্তিযোদ্ধা আব্দুল খালেকের রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন কালীগঞ্জে মসজিদ, মন্দির ও শশ্মানে আর্থিক সহায়তা প্রদান প্রয়াত জাতীয় নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের স্বপ্নের দিরাই শাল্লা সড়কের কাজ উদ্বোধন দোয়ারাবাজারে মৎস্য ব্যবসায়ীদের ধর্মঘট উপজেলাজুড়ে মাছের জন্য হাহাকার কালিয়ায় বঙ্গবন্ধুর জুলিও কুরি শান্তি পদক প্রাপ্তির ৫০ বছর উদ্‌যাপন নবীনগর স্কুলের টাকা আত্মসাতের কথা স্বীকার করলেন প্রধান শিক্ষক! মোংলায় বজ্রপাতে নিহত ১, আহত ১

৭১’য়ের চার খলিফা ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম,আন্দোলন-মুক্তিযুদ্ধে রূপান্তর অবশেষে বিজয়

সিকদার গিয়াসউদ্দিন।
  • আপডেট সময় : ০৪:৫৪:০০ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৩ ৪৬ বার পড়া হয়েছে
দেশের সময়২৪ অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

আমেরিকার পূর্ব উপত্যকায় তখন রাত ১২ঃ৪৮ মিনিট। প্রবাসী বাংলাদেশীদের অন্যতম গনমাধ্যম “প্রবাস মেলা”র নির্বাহী সম্পাদক শহীদ রাজু ফোনে জানালো নূরে আলম সিদ্দিকী ভাই আর নেই। বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিলো।তিনি পদ্মা মেঘনা যমুনার খরস্রোতা ঢেউয়ের ধ্বণি প্রতিধ্বনি কিংবদন্তি ছাত্রনেতা।

১৯৭০/৭১ সালে বাঙালী জাতির হৃদয়ের মনিকোটায় সমগ্র অস্থিত্বের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিলো চার খলিফার নাম।ডাকসূ’র প্রথমবারের মত সরাসরি নির্বাচিত ভি পি আ স ম আবদুর রব,সাধারন সম্পাদক আবদুল কুদ্দুস মাখন,তথাকথিত পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকী,সাধারণ সম্পাদক শাজাহান সিরাজ। তখনকার সাড়ে সাত কোঠি বাঙালীর তরুন,যুবা ,বৃদ্ধ এককথায় সকলের আন্দোলনের,সংগ্রামের অনুপ্রেরনার অন্যতম উৎস এই চারজন।একমাত্র জনগনই এবং জনগনের রক্তকনিকায়, অস্থিমজ্জায় যাঁদের নাম তখন প্রতিদিন উচ্চারিত হতে দেখা যেতো-সেই জনগনের ভরষা ও আকাঙ্কা থেকে জনগনই তাঁদের চার খলিফার অভিধায় অভিষিক্ত করেন।স্বাধীনতা পূর্ব সময়ে শুধু চার খলিফা নয়-জাতীয় থেকে তৃণমূল পর্যায়ের ছাত্রনেতাদের বক্তব্য সাধারণ জনগন দেবতার বানী হিসাবে হৃদয়ে ধারন করতো।দীর্ঘ কয়েক যুগের ব্যবধানে বর্তমান প্রজন্মের ছাত্রছাত্রীগন শুনে বিস্ময়ে অবাক হওয়ার কথা বটে। এসব এখন যাদুঘরের সম্পদ।

IMG 20230415 WA0006

সবচেয়ে যেটি অবাক করা বিষয়-তা হচ্ছে বাংলাদেশই একমাত্র দেশ যে দেশের ভাষা আন্দোলন,স্বাধীনতা আন্দোলন ও সংগ্রামের একমাত্র সূতিকাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকে সমগ্র দেশ আগ্নেয়গিরির উত্তপ্ত লাভার মত জ্বলে উঠতো।১৯৯০/৯১’য়ের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন সংগ্রাম অবশেষে বিজয় পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকতে দেখা গেছে।এখন সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম শুনলে দিনমজুর,রিক্সাওয়ালা থেকে শুরু করে সমাজের সর্বস্তরের লোকজনকে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে দেখা যায়!

IMG 20230415 WA0025

১৯৫২’সালের ভাষা আন্দোলনে সকল রাজনৈতিক নেতাদের মতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা ২১’শে ফেব্রুয়ারী ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে আন্দোলন শুরু করলে শহীদ হন সালাম,জব্বার,বরকত, রফিকসহ অনেকেই। প্রয়াত গাজীউল হক ও আবদুল মতিন,গোলাম মাহবুব, অলি আহাদ সহ দেশব্যাপী জাতীয় ও তৃণমূলের ছাত্রনেতাদের তখন থেকেই জনগন হৃদয়ে ধারণ করা শুরু করে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব বাধ্য হয়ে ছাত্রছাত্রীদের দাবীদাওয়ার প্রেক্ষাপটে একদিকে নিরুপায় অন্যদিকে নিজেদের কৃতিত্ব জাহির করতে ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলনের সাথে একাত্মতা ঘোষনা করেন। অবশ্য বিজয় অর্জনে তা অবশ্যকরণীয় ছিলো।

IMG 20230415 WA0026

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একসময় ছিল ছাত্র ইউনিয়নের স্বর্গরাজ্য।১৯৬২’সালের শিক্ষা আন্দোলনের পর থেকে ধীরে ধীরে তা নিম্নমূখী হতে থাকে।ছাত্রলীগ আস্তে আস্তে মাথা ছাডা দিয়ে উঠার সময়।ছাত্র ইউনিয়ন একসময় চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারার পক্ষে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়লে ছাত্রলীগের বিস্ময়কর উত্থান ঘটে। অবশ্য ছাত্রলীগেও দু’টি ধারা অব্যাহত ছিলো। একটি ধারার নেতৃত্ব ছিলো নূরে আলম সিদ্দিকীর ভাষায়-শেখ ফজলুল হক মনি,কে এম ওবায়দুর রহমান ও শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন।অপর ধারার নেতৃত্বে ছিলেন সিরাজুল আলম খান। একটি ধারা স্বায়ত্ত্বশাসন অর্জনের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অন্য ধারাটি সরাসরি স্বাধীনতা ধারার। এককথায় সকলের লক্ষ্য ছিল স্বাধীনতা অর্জন। তাই চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজনীতির পরিবর্তে সরাসরি বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের বিষয়টি ছাত্রছাত্রীদের মাঝে ব্যাপক আলোড়ন তৈরী করে।

IMG 20230415 WA0021

কথিত আছে,১৯৬২/৬৩ সালের দিকে শেখ ফজলুল হক মনি’র প্রায়শঃ রক্তবমি দেখা গেলে ডাক্তারের পরামর্শে রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহন করেন। তখন থেকেই ১৯৬৯’সালের গনঅভ্যূত্থান পর্যন্ত সিরাজুল আলম খানের একক কর্তৃত্বে ছাত্র লীগ পরিচালিত হতে থাকে বলে তখনকার প্রজন্মের নেতাদের বলতে দেখা যায়। গনঅভ্যূত্থানের পরে “ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা” থেকে নিঃশর্ত মুক্তিলাভের পর শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ অভিধায় অভিষিক্ত করার পর শেখ ফজলুল হক মনি রাজনীতিতে পূনরায় আভির্ভূত হন। এক পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মাধ্যমে ছাত্রলীগের দু’টি ধারা একত্রে পদ্মা মেঘনা ও যমুনার মোহনায় মিলিত হয়।সিরাজুল আলম খান, শেখ ফজলুল হক মনি, আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদকে নিয়ে বি এল এফ গঠন করা হয়।কাজী আরেফ আহমেদ বি এল এফ’য়ের গোয়েন্দা প্রধান হিসাবে কাজ করেন বলে নিউক্লিয়াসের সাথে যুক্ত অনেকের লেখায় দেখা যায়।

IMG 20230415 WA0002

১৯৭২ সালের অক্টোবরে পল্টন ও রেসকোর্স ময়দানে ছাত্রলীগের দুটি ধারার কনভেনশনকে কেন্দ্র করে একদিকে মুজিববাদী ছাত্রলীগ ও অন্যদিকে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রী ছাত্রলীগ নামে দ্বিধাবিভক্তির বিষয়টি সর্বজনবিদিত।অবশ্য তা আরও পরের ব্যাপার বটে!

মূলতঃ ছাত্রলীগে তোফায়েল আহমেদ ও আ স ম আবদুর রব যথাক্রমে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হলে ছাত্রলীগের অবস্থান তুঙ্গে উঠে। ছাত্র ইউনিয়নের অবস্থান তখন আগের মত আর মজবুত ছিলনা।স্মরণ রাখতে হবে যে, তখন কাউন্সিল অধিবেশনে ডেলিগেটদের মাধ্যমে সরাসরি ছাত্রনেতাগন নির্বাচিত হতেন।একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হল সংসদে ছাত্রলীগ ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্টতা পেলে তোফায়েল আহমেদ ডাকসূ ভি পি হন। অতঃপর আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা নিয়ে আন্দোলন গন অভূত্থানের রূপ ধারণ করে।তোফায়েল আহমেদ নায়ক হিসাবে আভির্ভূত হন।সেই সময়ে পাঁচপাত্তুর ও খোকা গংয়ের বিপরীতে সিরাজুল আলম খানের সরাসরি তত্তাবধানে খসরু-মন্টুর আবির্ভাব ও উত্থান ছাত্রলীগের অব্যাহত অগ্রযাত্রার ক্ষেত্রে বিস্ময়কর অবদানের কথা তখনকার ছাত্রছাত্রীদের মূখে এখনও বলতে দেখা যায়।

IMG 20230415 WA0016

বিভিন্ন মাধ্যমে এখন সর্বজনবিদিত যে, ১৯৬২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিউক্লিয়াসের শুভ সূচনা ঘটে সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক ও কাজী আরিফ আহমেদের নেতৃত্বে। ১৯৬৪ সালের দিকে তা বিস্তৃত হতে থাকে।আওয়ামী লীগের তখনকার কেন্দ্রীয় কমিটির অনেকের অভিযোগের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে,ছাত্রলীগের ব্যাপক সমর্থন ও চট্টগ্রামের এম এ আজিজের অবিস্মরণীয় সাহসী সিদ্ধান্তে শেখ মুজিবুর রহমান চট্টগ্রাম শহরের লালদিঘী ময়দানে ছয়দফা ঘোষণা করেন। তখনকার পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ূব খাঁনের উসকানীতে তৎকালীন পাকিস্তানের স্পীকার চট্টগ্রামের ফজলুল কাদের চৌধুরীর লাটিয়াল বাহিনীকে শক্ত হাতে ছাত্রলীগ ও চট্টগ্রামের জনগন এম এ আজিজের নেতৃত্বে প্রতিরোধ প্রতিহত করার বিষয়টিও বিস্ময়কর বটে।তখন থেকেই ছয় দফার মাঝে স্বাধীন বাংলাদেশের ভ্রুণ আবিস্কারের বিষয়টি নিউক্লিয়াসের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যাপক অবদানের বিষয়টি স্বীকৃত।

গন অভ্যূত্থানকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ নেতৃত্ব ব্যাপকভাবে বিকশিত হতে থাকে।আ স ম আবদুর রব ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক হিসাবে ইতিমধ্যেই ছাত্রসমাজে ব্যাপক জনপ্রিয়তার শীর্ষে।নূরে আলম সিদ্দিকীর দরাজকন্ঠের পদ্মা মেঘনা যমুনার খরস্রোতা ঢেউয়ের মত অসাধারণ বাগ্নীতায় কাব্যময় বক্তৃতা ও ছাত্রনেতাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী কারানির্যাতনভোগী হিসাবে সারাদেশের ছাত্রসমাজের কাছে ব্যাপক গ্রহনযোগ্যতার বিষয়টি সর্বত্র পরিলক্ষন করার মতো ছিলো। অন্যদিকে শাজাহান সিরাজের সাংগঠনিক দক্ষতা ও সমন্বয়ক তথা দুই বিরোধী ধারার মাঝে সহাবস্থান এবং অমায়িক ও সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলের সাথে সংশ্লিষ্টতা সহ সকলের সাথে মধুর ব্যবহারের অনন্য সংযোজন ছিল আবদুল কুদ্দুস মাখন।সকলেরই বক্তব্য রাখার আলাদা ঢং ও স্বকীয়তা ছিল।মাঠে ময়দানে সর্বত্র উপরোক্ত ছাত্রনেতা চতুষ্টয়কে দেখা যেতে থাকে।সারাদেশের ছাত্র সমাজের দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়।

ছাত্রলীগের কনভেনশনে ব্যাপক বিরোধিতার মুখেও ডেলিগেটদের ভোটে নূরে আলম সিদ্দিকী সভাপতি নির্বাচিত হন। শাজাহান সিরাজ সহজেই সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। উল্লেখ্য যে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে নিউক্লিয়াস জাতীয় ও তৃণমূল পর্যায়ে ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্রকে কেন্দ্র করে সাধারণ সম্পাদকের পদটি নিজেদের বলয়ে ধরে রাখতে সক্ষম ছিলেন। অতঃপর ডাকসূ নির্বাচন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে প্রথমবারের মত সরাসরি নির্বাচন।দেশব্যাপী ব্যাপক জল্পনা কল্পনার মধ্যেই দুই ধারার সমন্বয়ে যথাক্রমে নিউক্লিয়াস ধারার আ স ম আবদুর রব ভি পি ও শেখ ফজলুল হক মনি ধারার আবদুল কুদ্দুস মাখন যথাক্রমে জি এস মনোনীত হন। অবশ্য মনোনয়নে সারাদেশের ছাত্রসমাজের ও সাধারন মানুষের ব্যাপক জনসমর্থনের বিষয়টিই ছিল মূখ্য। সিরাজুল আলম খানের ভাষায় নূরে আলম সিদ্দিকীর অসাধারণ বাগ্নীতা,কাব্যময় দরাজ কন্ঠ,আ স ম রবের সাহস ও ভরাট গলা,মানুষকে কাছে টানার দক্ষতা, আন্দোলনে সংগ্রামে সাধারনকে আবেগতাড়িত ও উদ্বেলিত করার ক্ষমতা,
শাজাহান সিরাজ ও আবদুল কুদ্দুস মাখনের সাংগঠনিক দক্ষতা ও সাধারনের মাঝে সহজেই মিশে গিয়ে সাধারন ছাত্রছাত্রী সহ যে কাউকে কাছে টানার ক্ষমতা সব মিলিয়ে এই চতুষ্টয়ের মধ্য দিয়ে হাজার বছরের স্বপ্নকে স্বার্থক করে তোলার বিষয়ে নিউক্লিয়াসকে তিনি একমত করাতে পেরেছিলেন। কৌশলে শেখ ফজলুল হক মনি ও তোফায়েল আহমেদকে একই কাতারে সামিল করানোর বিষয়টি অনেকের লেখায় বুঝতে পারার মতো।অনুভব ও অনুধাবন করার মতো।

জানা যায় যে, তোফায়েল আহমেদকে ডাকসূ ভি পি হিসাবে নির্বাচিত করার পরপরই সিরাজুল আলম খান শেখ মুজিবুর রহমানের (তখনও বঙ্গবন্ধু হননি)কাছে নিয়ে যান।তারও আগে ধানমন্ডির মাঠে তোফায়েল আহমেদকে বক্তৃতার নানা বিষয়ে সিরাজুল আলম খান কর্তৃক পাঠদানের বিষয়টি নানাজনের লেখায় দেখা যায়। নূরে আলম সিদ্দিকীর মতে জাসদ গঠনের আগে ও পরে বঙ্গবন্ধুর সাথে সিরাজুল আলম খানের সম্পর্ক অটুট ছিলো।তবে তোফায়েল আহমেদ পরবর্তিতে শেখ ফজলুল হক মনি ধারার সাথে গাঁটছড়ার বন্ধনে জডিয়ে পড়েন। মতবিরোধ স্বত্ত্বেও তোফায়েল আহমেদ বিভিন্ন টকশো’তে সিরাজুল আলম খানকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন।নূরে আলম সিদ্দিকী প্রকাশ্যে প্রথম থেকেই সিরাজুল আলম খানের আদর্শের বিরুদ্ধে উচ্চকন্ঠ থাকলেও সিরাজুল আলম খানকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন। আমাদের স্মরণ রাখতে হবে যে, উল্লেখিত সকলেই একজন বঙ্গবন্ধু তৈরীতে, রাজনৈতিক কাল্ট তথা একক জাতীয় নেতা হিসাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতীয়ভাবে প্রতিষ্টিত করার জন্য অহর্নিশি হাঁডভাঙ্গা পরিশ্রমের বিষয়টিও সর্বজনবিদিত বটে।বেগম ফজিলতুন্নেছা মুজিবের সাথে উল্লেখিত সকলের যোগাযোগ ও চমৎকার সম্পর্ক ছিলো। বঙ্গবন্ধুকে সকলেই ‘লীডার’বলে সম্বোধন করতেন।

অবশেষে ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচন। আলাদা আলাদা ভাবে আ স ম আবদুর রব, আবদুল কুদ্দুস মাখন, নূরে আলম সিদ্দিকী,শাজাহান সিরাজ উল্কার বেগে সারাদেশে আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করার জন্য চষে বেড়াচ্ছেন।উদাত্ত আহব্বান জানাচ্ছেন। বঙ্গবন্ধুও আওয়ামী সারথীদের নিয়ে সারাদেশে আলোড়ন তৈরীতে সক্ষম হয়েছেন। সারাদেশের জনগনের হৃদয়ের মনিকোটায় ও প্রকাশ্যে ধীরে ধীরে চার খলিফার নাম উচ্চারিত হতে থাকে। সদ্যভূমিষ্ট অনেক সন্তানের নাম চার খলিফার নামের সাথে মিল রেখে রাখতে দেখা যায়। পত্রপত্রিকায় একদিকে বঙ্গবন্ধুর নাম অন্যদিকে চার খলিফার মাধ্যমে উত্তাল জনসমুদ্র আর জ্বালাময়ী ভাষনের বিষয়টি মূখ্য হয়ে দাঁড়ায়। কখনো কখনো তোফায়েল আহমেদ, তাজউদ্দিন আহমেদ (আলীগের সাধারন সম্পাদক অবশ্য তখনও যুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী হননি) ও চট্টগ্রামের এম এ আজিজের নাম মাঝে মাঝে শুনা যেতো। বঙ্গবন্ধু ও চার খলিফার নামের আড়ালে সবই একাকার তখন। তখনকার জীবিত যে কাউকে জিজ্ঞ্যেস করলে সহজেই সত্যতা মিলবে।
আওয়ামী লীগ পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদে ভূমিধ্বস বিজয় অর্জন করে।গত কয়েকযুগের ব্যবধানে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মানুষ ১৯৭০ সালের নির্বাচনকে জনগনের দ্বারা জনগন কর্তৃক সত্যিকার অর্থে সবচেয়ে শ্রেষ্ট নির্বাচন বলে লোকমূখে ব্যাপক জনশ্রুতি এখনও দেখা যায়।

চতুর্দিকে আওয়ামী লীগের ভূমিধ্বস বিজয়ের জয়ধ্বনি ও জয়জয়াকার। বিজয় আওয়ামী লীগের হলেও জাতীয় ও তৃণমূলের ছাত্রলীগ নেতা ও কর্মীরা জনগনের ভালবাসার তুঙ্গে।ছাত্রলীগ নেতা ও কর্মীরা জনগনের মমতায় আপ্লুত ও উদ্দীপ্ত। গ্রামে গন্জে চায়ের দোকানে সর্বত্র বঙ্গবন্ধু এবং চার খলিফার নামে নানা কল্পকাহিনী।

অবশেষে পশ্চিম পাকিস্তানের ভূট্টোসহ সামরিক কর্তাদের চক্রান্তে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় না বসানোর জন্য তালবাহানা শুরু করে।নিউক্লিয়াস ও ছাত্রলীগ নেতৃত্ব ততদিনে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিকল্প যে নেই-তা অনুধাবনে সক্ষম হয়। ছাত্রলীগের প্রস্তুতিগ্রহন প্রক্রিয়া আগে থেকে চলমান ছিল বিধায় প্রস্তুতি গ্রহনে তেমন সময় লাগেনি।৭০’য়ের নির্বাচনী প্রচারনায় স্বাধীনতা অর্জনের স্বপক্ষে কখনো গোপনে কখনো কৌশলে কথামালার ফুলঝুরি দিয়ে জনমত ও জনসচেতনতা গড়ে তুলতে চার খলিফার অবদানের বিষয়টির জনশ্রুতি এখনও বহমান।

পাকিস্তান সামরিক সরকার প্রধান ইয়াহিয়া খান ১’মার্চ,১৯৭১ সালে নানা তালবাহানা ও সময় ক্ষেপণের পর অবশেষে পার্লামেন্ট অনির্দ্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ ঘোষনা করলে সারাদেশ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ দেশের সকল শিক্ষাঙ্গন ও ইন্ডাষ্ট্রিয়াল এরিয়া আগ্নেয়গিরির মত উত্তপ্ত হয়ে উঠে। ছাত্র শ্রমিক ও জনগনের প্রচন্ড চাপে চারখলিফার নেতৃত্বে ১৯৭১’সালের ১’লা মার্চ রাতে লক্ষ জনতাকে সাক্ষী রেখে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়।পরদিন নিউক্লিয়াসের পরামর্শক্রমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সামনে ছাত্র শ্রমিক ও সকল স্তরের জনসমাবেশের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়া হয়।

পরদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র শ্রমিক ও সাধারন জনগনের উপস্থিতিতে তিল ধরনের জায়গা কোথাও ছিলনা।সর্বত্র লোকে লোকারণ্য।ছাত্রনেতারা বাধ্য হয়ে কলাভবনের ছাদে অবস্থান নেন। চতুর্দিকে পাকিস্তান মিলিটারী কর্তৃক পরিবেষ্টিত। মেশিন গান ও রাইফেল কাঁধে পাক হায়েনা বাহিনী। আকাশে সশস্ত্র হেলিকপ্টার ঘূরছেতো ঘুরছেই। সেদিকে কারো ভ্রুক্ষেপ যেমন নেই তেমনি জীবন গেলেও কেউ সভাস্থল ছেড়ে না যাওয়ার প্রতিজ্ঞায় মুষ্টিবদ্ধ হাতে জ্বালাময়ী শ্লোগানের পর শ্লোগানে আকাশ বাতাস কেঁপে তুলতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেনি। অবশেষে চার খলিফার উপস্থিতিতে ডাকসূ ভি পি আ স ম আবদুর রব স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকা উত্তোলন ও চতুর্দিকে ঘূরিয়ে ঘূরিয়ে প্রদর্শন করলে শ্লোগানের পর শ্লোগানে আকাশ বাতাস বিদীর্ন হতে থাকে। চতুর্দিকে উপস্থিত ছাত্র শ্রমিক জনগনের চোখেমূখে আনন্দাশ্রু গড়িয়ে পড়ছে।পরদিন ৩’রা মার্চ পল্টনে সবাইকে উপস্থিত থাকতে বলা হয়। উল্কার বেগে সে খবর নারায়নগন্জ সহ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে।

পত্রপত্রিকা, সোশ্যাল মিডিয়া,বিজ্ঞজনদের ভাষায়-“২’রা মার্চে পতাকা উত্তোলন বিশেষতঃ আওয়ামী লীগের পাকিস্তানের সিংহাসনে আরোহনের স্বপ্নকে চিরদিনের জন্য পেরেক মারা হয়েছিলো॥”
অনেকে আবার বলেছেন যে, “খোদা না খাস্তা-বাংলাদেশ স্বাধীন না হলে চার খলিফার হাড্ডি মাংস খুঁজে পাওয়া যেতোনা।”

নূরে আলম সিদ্দিকীর সভাপতিত্বে ৩’মার্চ,১৯৭১। পল্টন ময়দান সরগরম।লক্ষ জনতার সমাবেশ। শ্লোগানের পর শ্লোগান। অবশেষে শাজাহান সিরাজ ইশতেহার পড়লেন। এরই মাঝে অনির্ধারিতভাবে বঙ্গবন্ধু পল্টন ময়দানের মন্চে আরোহন অত্যন্ত তাৎপর্য্যপূর্ণ ছিল বলে অনেকেই মনে করেন। বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতে ২য়বারের মত ইশতেহার পাঠ করলেন শাজাহান সিরাজ।স্বাধীন বাংলাদেশের আয়তন, স্বাধীনতার স্থপতি, পতাকা,জাতীয় সঙ্গীত সহ এমন কোন কিছু বাকী নেই যা ইশতেহারে ছিলনা। স্মরণ রাখতে হবে যে,ইশতেহার শব্দের অর্থ প্রক্লেমেশন বা ঘোষনা। বঙ্গবন্ধু ও লক্ষ জনতার উপস্থিতি, অনুমোদনের বিষয়টি সকলেই জানে। তারপরেও ঘোষনা নিয়ে বাগাড়ম্বরের কারন আছে কি? স্বাধীনতা অর্জনের পর কোন সরকারই ইশতেহারের বিষয়ে স্পষ্ট করে কোন কিছু বলেছেন কি? বঙ্গবন্ধুর নামে জিয়ার ঘোষনাপাঠ বাঙালী ইপিআর পুলিশ ও সেনাবাহিনীকে উদ্দীপ্ত করেছিলো-এই সরল সত্যটুকু স্বীকার করতে দ্বিধান্বিত হওয়ার অবকাশ নেই।আওলিয়া হওয়ার দরকার আছে কি?তখনকার প্রেক্ষাপটে জিয়াউর রহমান অপরিচিত ছিলেন।তিনি একজন সাধারন মেঝর থেকে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার ছিলেন এটিও ঐতিহাসিক সত্য। ১৯৭৪ সালে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় লেখা নিবন্ধে জিয়াউর রহমান নিজেকে কখনও ঘোষক বলেননি। মুক্তিযুদ্ধ আর্কাইভে তা জমা থাকার কথা। তিনি বাকশালের সদস্য হওয়ার জন্য আবেদন জানানোর কথা কাউকে বলতে দেখা যায়না।নিম্নে পত্রিকায় প্রকাশিত ১৯৭১ সালের ৪’মার্চ প্রকাশিত ইশতেহার ও অথেনথিক ছবি দেখেই বুঝতে পারা যায় যে, এসব ছবি হাজার বছরের কথা বলে।উল্লেখ্য যে ৩’রা মার্চ পল্টন ময়দান থেকেই ৭’ই মার্চে রেসকোর্স ময়দানে জনসভার ঘোষনা দেন বঙ্গবন্ধু।

ঐতিহাসিক ৭’ই মার্চ। রেসকোর্স ময়দান।সকাল থেকেই চার খলিফার কড়া নিরাপত্তা ও নেতৃত্বে সুললিত ভরাট কিংবা দরাজ কন্ঠে মন্চ ও রেসকোর্স ময়দানের জনসভারস্থল সরগরম। নিরাপত্তার চাদরে মন্চ ও জনসভার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ সহ ঢাকা শহরের বেশীর ভাগ স্কুল কলেজের অসংখ্য ছাত্রছাত্রীরা ভলান্টিয়ার হিসাবে দায়িত্বরত।অতঃপর নেতা এলেন। ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ট ভাষণ দিলেন। বাঙালীর হৃদয় জয় করলেন।”এবারের সংগ্রাম-মুক্তির সংগ্রাম।এবারের সংগ্রাম-স্বাধীনতার সংগ্রাম॥” আ স ম আবদুর রব বলেছেন-বঙ্গবন্ধুর ৭’ই মার্চের ভাষণ আব্রাহাম লিংকনের গেটিসবার্গের ভাষণের সাথে তুলনীয়।

অতঃপর এলো ২৩’শে মার্চ। পাকিস্তান দিবসের পরিবর্তে প্রতিরোধ দিবস।ঐদিন সারাদেশে পাকিস্তানী পতাকার পরিবর্তে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলিত হয়।কেবলমাত্র ঢাকা ক্যান্টনম্যান্ট ব্যতিত।ঢাকায় পল্টন ময়দানে চারখলিফাকে আনুষ্ঠানিকভাবে জয়বাংলা বাহিনী ও মহিলা জয়বাংলা বাহিনী গার্ড অব অনার প্রদান করেন।ঐদিন বাংলাদেশের হারকিউলিস খ্যাত কামরুল আলম খান খসরু রাইফেল উঁচিয়ে উপরের দিকে গুলি ছুঁড়ে স্বাধীনতা আন্দোলনকে মুক্তিযুদ্ধে রূপান্তরের সূচনা করেন। জয়বাংলা বাহিনীর ব্যান্ডের তালে তালে পতাকা উত্তোলন করেন হাসানুল হক ইনু। উল্লেখ্য যে,জয়বাংলা বাহিনীর অধিনায়ক ও উপ অধিনায়ক যথাক্রমে আ স ম আবদুর রব ও কামরুল আলম খান খসরু।

ঐদিন আমেরিকার এবিসি টেলিভিশনের বিশ্ববিখ্যাত সাংবাদিক টেড কপেল ভিডিওতে সব ধারন করেন এবং ২৬’শে মার্চ ১৯৭১’য়ে তা প্রচারিত হয় বিশ্বসংবাদে। ইউটিউব এবং নিম্নে প্রদত্ত লিংকে তা দেখা যেতে পারে।গার্ড অব অনার শেষে চার খলিফার নেতৃত্বে বিশাল মিছিলের বহর নিয়ে ৩২ নম্বরের বঙ্গবন্ধুর বাসায় গমন করেন।ছবিতে আ স ম আবদুর রবের হাত থেকে স্বাধীন বাংলার পতাকা গ্রহন করে বঙ্গবন্ধুকে পতাকাটি চতুর্দিকে দোলাতে দেখা যায়।

এলো বাঙালী জাতির ইতিহাসের জঘন্যতম কালোরাত।শুরু হলো পাক হায়েনা বাহিনীর পৈশাচিক উল্লাস। অপারেশন সার্চ লাইটের নামে বর্বরোচিত গনহত্যা।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়,রাজারবাগ পুলিশ লাইন সহ ঢাকার সর্বত্র আগুনের লেলিহান শিখা ও সর্বত্র হায়েনার গুলিতে জর্জরিত।ট্যাংকের চাকায় পিষ্ট। কোলের শিশু,ছোট ছোট সন্তান, নারী পুরুষ বৃদ্ধ,যুবক কেউই রেহাই পাইনি। এরই মাঝে বঙ্গবন্ধুকে বন্দি করে পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে নিক্ষেপ করার প্রক্রিয়া শেষ। আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তিযুদ্ধ শুরু সারাদেশে তথা ঢাকা,চট্টগ্রাম,খুলনা ও রাজশাহী সর্বত্র আক্রমন-পাল্টা আক্রমন।

মুক্তিযুদ্ধে চার খলিফার ব্যাপক কর্মকান্ডও অবিস্মরণীয়। সে কাহিনী অন্যসময় অন্যকেউ লিখবে বা ইতিমধ্যেই রচিত হতেও পারে।১৬’ই ডিসেম্বর বিজয়ের দিনেই আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বে ঢাকা রেডিও ষ্টেশন দখল করে ‘বাংলাদেশ বেতার’ নামে আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার কথা জানা যায়।পরবর্তিতে যুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের বিশেষ অনুরূধে চার খলিফা সমগ্র দেশ ও জাতিকে বঙ্গবন্ধু দেশে না ফেরা পর্যন্ত ঐক্যবদ্ধ থাকার জন্য দেশবাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্ববান জানাতেন।চার খলিফার তেলেসমাতি তথা বিশ্বাসযোগ্যতা এত বেশী ছিল যে, জনগন অক্ষরে অক্ষরে তা পালন করতেন। লোকে বলে বঙ্গবন্ধু দেশে ১০’ই জানুয়ারী’১৯৭২ সাল।না ফেরা অবধি চুরি,ডাকাতি,ধর্ষণ,স্মাগলিং,দূর্ণীতি,খূন বা গুমের কোন ইতিহাস নেই। তখন সারাদেশ মুক্তিযুদ্ধ ফেরত ছাত্রলীগনেতা ও কর্মী,অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধা তরুন তুর্কিদের নিয়ন্ত্রনে কঠোর নিরাপত্তায় সদ্য স্বাধীন দেশ পরিবেষ্টিত ছিল।সেই দিনগুলোতে স্বাধীনতার প্রকৃত স্বাদ বলতে কি বুঝায়- সেই সময়ের প্রজন্মের মূখে এখনো তা শুনা যায়॥

নূরে আলম সিদ্দিকী সহ চার খলিফার তিন খলিফা প্রয়াত। অনন্তলোকে মিশে আছেন। প্রথমে আবদুল কুদ্দুস মাখন ভাই অকালে পাড়ি জমিয়েছেন।অর্থের অভাবে যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসা শেষ করতে পারেননি। উনার পবিত্র দেহ বাংলাদেশে নিয়ে যেতে অনেক কাঠখড় পোড়ানোর নাটক অনেকেই জানার কথা। অবশেষে দেশের মাটিতে দাফন কাফন।শাজাহান সিরাজ ভাই দীর্ঘদিন রোগে ভোগে অবশেষে সকলের মায়া ত্যাগ করে পরপারে গমন করেছেন। এখন নূরে আলম সিদ্দিকী ভাইয়েরও জীবনাবসান। তিন তিনটি কিংবদন্তি নক্ষত্র এখন অনন্তলোকে। একসময়ের সবচাইতে উজ্জ্বল নক্ষত্রটি এখনও টিমটিম করে জ্বলছে।তিনি আ স ম আবদুর রব।১৯৭২’সাল থেকে এখনও ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক চরিত্র হননের শিকার।’জন্মিলে মরিতে হইবে।’ তিনিও একদিন আমাদের মায়া ত্যাগ করে চলে যাবেন।মহান সৃষ্টিকর্তা উনাকে আরও দীর্ঘজীবন দান করুন। অন্ততঃ গনতান্ত্রিক আচরনের সমৃদ্ধির জন্য নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রানিত করতে রব ভাইয়ের প্রয়োজন আছে বলে অনেক বিজ্ঞজনের লেখা ও সোশ্যাল মিডিয়াতে বলতে লিখতে দেখা যায়।

পৃথিবীর সব দেশে স্বাধীনতা বা বিজয় অর্জনের পর আন্দোলন সংগ্রামের নেতাগনের মধ্যে বিভেদ অবশ্যাম্ভাবী হয়ে উঠে।ব্যক্তিগত অবিশ্বাস,ক্ষোভ,অভিমান কিংবা আদর্শগত কারনে বিভেদ বিচ্ছেদ হলেও ইতিহাসের সামগ্রিক মূল্যায়ন থেকে পৃথিবীর কোন দেশে তাঁদের বন্চিত করা হয়নি। বাংলাদেশে তার উল্টোটা বিস্ময়কর বটে! ১৯৭৫ পরবর্তি সময় থেকে এখনও বাংলাদেশের ইতিহাসের ও ঐতিহাসিক চরিত্রের মূল্যায়নে ম্যানিপুলেশন অসহনীয় বলে লোকমূখে বলতে শুনতে পাওয়া যায়। যখন যারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকে তারা তাদের মত করে ইতিহাস সাজানোতে তৎপর বলে বিভিন্ন লেখা ও টকশো’তে দেখা যায়।বিজ্ঞজনদের কথা বাদই দিলাম।সোশ্যাল মিডিয়া ও লোকমূখে তা সবসময় শুনতে বা বলতে দেখা যায়। যাই হোক চার খলিফার ক্ষেত্রেও অন্যথা হয়নি।

আদর্শগত কারনে নূরে আলম সিদ্দিকী ও আবদুল কুদ্দুস মাখন একদিকে। আ স ম আবদুর রব ও শাজাহান সিরাজ অন্যদিকে।তবে অত্যন্ত আশ্চর্য্যের বিষয় এই যে, গত কয়েকযুগের ব্যবধানে পদ্মা মেঘনা যমুনার জল যতই গড়িয়ে যাকনা কেনো-উনাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সম্পর্ক ছিলো অনেক মধুর। নূরে আলম সিদ্দিকী ভাই ও শাজাহান সিরাজ ভাইয়ের মূখে চারজনকে কোন না কোনদিন আগামীর সন্তানেরা একত্রে সমাধিস্থ করার স্বপ্ন দেখতেন। তবে এটা ঠিক যে, শত বছর পরে হলেও চার খলিফা এভারেষ্ট শৃঙ্গের নীচে হিমালয়ের পর্বতমালা হিসাবে বিবেচিত হবেন। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি যতদিন থাকবে ততদিন চার খলিফার নাম মূছে দিতে কেউই সক্ষম হবেননা।আগামীর ঐতিহাসিকরা, সন্তানগন তা হতে দেবেনা।

খূবই দূঃখের সাথে বলতে হয় বাংলাদেশের কোন দৈনিক আবদুল কুদ্দুস মাখন,শাজাহান সিরাজ, নূরে আলম সিদ্দিকীর মৃত্যুতে বড় আকারে তেমন কোন সংবাদ ছাপিয়েছে বলে মনে হয়না। রেডিও টেলিভিশনেও দায়সারা গোছের মত প্রতিবেদন।মানবজমিন নামক সংবাদপত্রটি কিছুটা বড় করে ছাপিয়েছে।যুগান্তর ও সমকাল আ স ম আবদুর রবের বিবৃতিকে হাইলাইট করলেও জাতীয় পত্রিকারগুলো দায়সারাভাবে সাদামাটা প্রতিবেদন বা বিবৃতি প্রকাশ করেছেন।

সমকাল ও যুগান্তর পত্রিকায় আ স ম আবদুর রবের লেখাটি সবচেয়ে তাৎপর্য্যপূর্ণ বলে অনেকে মনে করেন।কবি,সাহিত্যিক,সাংবাদিক জগৎ থেকে শুরু করে সকলেই তস্কর,চামচামি করে রাতারাতি আলাদিনের চেরাগ হাসিলে ব্যস্ত।বর্তমানের আর আগামীর সন্তানদের নিকট দায়বদ্ধতা বলে কোথাও কোনকিছু নেই। উদার ও মহৎ শব্দটি এখন যাদুঘরে। সমকাল ডাঃ জাফরউল্লাহ চৌধূরীকে সম্মান জানিয়ে যে উদাহরণ দেখিয়েছে-অন্যদের মধ্যে সে উৎসাহ বা সাড়া দেখা দেবে কি? চার খলিফা বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন এবং তা মুক্তিযুদ্ধে রূপান্তরের নায়ক। ইতিহাসের কষ্টিপাথরে যা ঐতিহাসিক আকর।যা ঘটছে, যা দেখছি,আগামী জমানার সন্তানেরা আমাদের দায়বদ্ধতা থেকে মুক্তি দেয়ার কথা নয়! তবে সমুদ্র মন্থন করে ইতিহাসের অমৃত কষ্টিপাথরের লেখা আগামীর প্রজন্ম তুলে আনবেই। আশাবাদের বিকল্প নেই।

৩১’শে মার্চ,২০২৩
যুক্তরাষ্ট্র

তথ্যসূত্রঃ
গুগল, উইকিপিডিয়া, ম্যাগাজিনস, মুক্তিযুদ্ধ আর্কাইভভূক্ত বই, সোশ্যাল মিডিয়া, টক’শো,পত্রপত্রিকা ইত্যাদি।
ছবি ও কৃতজ্ঞতাঃ গুগল,রশিদ তালুকদার,সুমন মাহমুদ,লিনু হক,মহিউদ্দিন আহমদ,মোহাম্মদ ইলিয়াছ মিয়া

লেখক সাবেক প্রথিতযশা ছাত্রনেতা, সাবেক সাধারণ সম্পাদক-কমিটি ফর ডেমোক্রেসী ইন বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্র ,সাবেক সদস্য সচিব-মুক্তিযুদ্ধ চেতনা পরিষদ, যুক্তরাষ্ট্র, সাবেক প্রতিষ্ঠাতা আহ্ববায়ক-কর্ণেল তাহের স্মৃতি সংসদ, যুক্তরাষ্ট্র,অন্যতম সমন্বয়ক-কানেক্ট বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল, উপদেষ্টা- জে এস ডি কেন্দ্রীয় কমিটি, বাংলাদেশ ।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

৭১’য়ের চার খলিফা ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম,আন্দোলন-মুক্তিযুদ্ধে রূপান্তর অবশেষে বিজয়

আপডেট সময় : ০৪:৫৪:০০ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৩

আমেরিকার পূর্ব উপত্যকায় তখন রাত ১২ঃ৪৮ মিনিট। প্রবাসী বাংলাদেশীদের অন্যতম গনমাধ্যম “প্রবাস মেলা”র নির্বাহী সম্পাদক শহীদ রাজু ফোনে জানালো নূরে আলম সিদ্দিকী ভাই আর নেই। বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিলো।তিনি পদ্মা মেঘনা যমুনার খরস্রোতা ঢেউয়ের ধ্বণি প্রতিধ্বনি কিংবদন্তি ছাত্রনেতা।

১৯৭০/৭১ সালে বাঙালী জাতির হৃদয়ের মনিকোটায় সমগ্র অস্থিত্বের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিলো চার খলিফার নাম।ডাকসূ’র প্রথমবারের মত সরাসরি নির্বাচিত ভি পি আ স ম আবদুর রব,সাধারন সম্পাদক আবদুল কুদ্দুস মাখন,তথাকথিত পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকী,সাধারণ সম্পাদক শাজাহান সিরাজ। তখনকার সাড়ে সাত কোঠি বাঙালীর তরুন,যুবা ,বৃদ্ধ এককথায় সকলের আন্দোলনের,সংগ্রামের অনুপ্রেরনার অন্যতম উৎস এই চারজন।একমাত্র জনগনই এবং জনগনের রক্তকনিকায়, অস্থিমজ্জায় যাঁদের নাম তখন প্রতিদিন উচ্চারিত হতে দেখা যেতো-সেই জনগনের ভরষা ও আকাঙ্কা থেকে জনগনই তাঁদের চার খলিফার অভিধায় অভিষিক্ত করেন।স্বাধীনতা পূর্ব সময়ে শুধু চার খলিফা নয়-জাতীয় থেকে তৃণমূল পর্যায়ের ছাত্রনেতাদের বক্তব্য সাধারণ জনগন দেবতার বানী হিসাবে হৃদয়ে ধারন করতো।দীর্ঘ কয়েক যুগের ব্যবধানে বর্তমান প্রজন্মের ছাত্রছাত্রীগন শুনে বিস্ময়ে অবাক হওয়ার কথা বটে। এসব এখন যাদুঘরের সম্পদ।

IMG 20230415 WA0006

সবচেয়ে যেটি অবাক করা বিষয়-তা হচ্ছে বাংলাদেশই একমাত্র দেশ যে দেশের ভাষা আন্দোলন,স্বাধীনতা আন্দোলন ও সংগ্রামের একমাত্র সূতিকাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকে সমগ্র দেশ আগ্নেয়গিরির উত্তপ্ত লাভার মত জ্বলে উঠতো।১৯৯০/৯১’য়ের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন সংগ্রাম অবশেষে বিজয় পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকতে দেখা গেছে।এখন সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম শুনলে দিনমজুর,রিক্সাওয়ালা থেকে শুরু করে সমাজের সর্বস্তরের লোকজনকে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে দেখা যায়!

IMG 20230415 WA0025

১৯৫২’সালের ভাষা আন্দোলনে সকল রাজনৈতিক নেতাদের মতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা ২১’শে ফেব্রুয়ারী ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে আন্দোলন শুরু করলে শহীদ হন সালাম,জব্বার,বরকত, রফিকসহ অনেকেই। প্রয়াত গাজীউল হক ও আবদুল মতিন,গোলাম মাহবুব, অলি আহাদ সহ দেশব্যাপী জাতীয় ও তৃণমূলের ছাত্রনেতাদের তখন থেকেই জনগন হৃদয়ে ধারণ করা শুরু করে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব বাধ্য হয়ে ছাত্রছাত্রীদের দাবীদাওয়ার প্রেক্ষাপটে একদিকে নিরুপায় অন্যদিকে নিজেদের কৃতিত্ব জাহির করতে ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলনের সাথে একাত্মতা ঘোষনা করেন। অবশ্য বিজয় অর্জনে তা অবশ্যকরণীয় ছিলো।

IMG 20230415 WA0026

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একসময় ছিল ছাত্র ইউনিয়নের স্বর্গরাজ্য।১৯৬২’সালের শিক্ষা আন্দোলনের পর থেকে ধীরে ধীরে তা নিম্নমূখী হতে থাকে।ছাত্রলীগ আস্তে আস্তে মাথা ছাডা দিয়ে উঠার সময়।ছাত্র ইউনিয়ন একসময় চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারার পক্ষে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়লে ছাত্রলীগের বিস্ময়কর উত্থান ঘটে। অবশ্য ছাত্রলীগেও দু’টি ধারা অব্যাহত ছিলো। একটি ধারার নেতৃত্ব ছিলো নূরে আলম সিদ্দিকীর ভাষায়-শেখ ফজলুল হক মনি,কে এম ওবায়দুর রহমান ও শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন।অপর ধারার নেতৃত্বে ছিলেন সিরাজুল আলম খান। একটি ধারা স্বায়ত্ত্বশাসন অর্জনের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অন্য ধারাটি সরাসরি স্বাধীনতা ধারার। এককথায় সকলের লক্ষ্য ছিল স্বাধীনতা অর্জন। তাই চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজনীতির পরিবর্তে সরাসরি বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের বিষয়টি ছাত্রছাত্রীদের মাঝে ব্যাপক আলোড়ন তৈরী করে।

IMG 20230415 WA0021

কথিত আছে,১৯৬২/৬৩ সালের দিকে শেখ ফজলুল হক মনি’র প্রায়শঃ রক্তবমি দেখা গেলে ডাক্তারের পরামর্শে রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহন করেন। তখন থেকেই ১৯৬৯’সালের গনঅভ্যূত্থান পর্যন্ত সিরাজুল আলম খানের একক কর্তৃত্বে ছাত্র লীগ পরিচালিত হতে থাকে বলে তখনকার প্রজন্মের নেতাদের বলতে দেখা যায়। গনঅভ্যূত্থানের পরে “ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা” থেকে নিঃশর্ত মুক্তিলাভের পর শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ অভিধায় অভিষিক্ত করার পর শেখ ফজলুল হক মনি রাজনীতিতে পূনরায় আভির্ভূত হন। এক পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মাধ্যমে ছাত্রলীগের দু’টি ধারা একত্রে পদ্মা মেঘনা ও যমুনার মোহনায় মিলিত হয়।সিরাজুল আলম খান, শেখ ফজলুল হক মনি, আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদকে নিয়ে বি এল এফ গঠন করা হয়।কাজী আরেফ আহমেদ বি এল এফ’য়ের গোয়েন্দা প্রধান হিসাবে কাজ করেন বলে নিউক্লিয়াসের সাথে যুক্ত অনেকের লেখায় দেখা যায়।

IMG 20230415 WA0002

১৯৭২ সালের অক্টোবরে পল্টন ও রেসকোর্স ময়দানে ছাত্রলীগের দুটি ধারার কনভেনশনকে কেন্দ্র করে একদিকে মুজিববাদী ছাত্রলীগ ও অন্যদিকে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রী ছাত্রলীগ নামে দ্বিধাবিভক্তির বিষয়টি সর্বজনবিদিত।অবশ্য তা আরও পরের ব্যাপার বটে!

মূলতঃ ছাত্রলীগে তোফায়েল আহমেদ ও আ স ম আবদুর রব যথাক্রমে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হলে ছাত্রলীগের অবস্থান তুঙ্গে উঠে। ছাত্র ইউনিয়নের অবস্থান তখন আগের মত আর মজবুত ছিলনা।স্মরণ রাখতে হবে যে, তখন কাউন্সিল অধিবেশনে ডেলিগেটদের মাধ্যমে সরাসরি ছাত্রনেতাগন নির্বাচিত হতেন।একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হল সংসদে ছাত্রলীগ ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্টতা পেলে তোফায়েল আহমেদ ডাকসূ ভি পি হন। অতঃপর আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা নিয়ে আন্দোলন গন অভূত্থানের রূপ ধারণ করে।তোফায়েল আহমেদ নায়ক হিসাবে আভির্ভূত হন।সেই সময়ে পাঁচপাত্তুর ও খোকা গংয়ের বিপরীতে সিরাজুল আলম খানের সরাসরি তত্তাবধানে খসরু-মন্টুর আবির্ভাব ও উত্থান ছাত্রলীগের অব্যাহত অগ্রযাত্রার ক্ষেত্রে বিস্ময়কর অবদানের কথা তখনকার ছাত্রছাত্রীদের মূখে এখনও বলতে দেখা যায়।

IMG 20230415 WA0016

বিভিন্ন মাধ্যমে এখন সর্বজনবিদিত যে, ১৯৬২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিউক্লিয়াসের শুভ সূচনা ঘটে সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক ও কাজী আরিফ আহমেদের নেতৃত্বে। ১৯৬৪ সালের দিকে তা বিস্তৃত হতে থাকে।আওয়ামী লীগের তখনকার কেন্দ্রীয় কমিটির অনেকের অভিযোগের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে,ছাত্রলীগের ব্যাপক সমর্থন ও চট্টগ্রামের এম এ আজিজের অবিস্মরণীয় সাহসী সিদ্ধান্তে শেখ মুজিবুর রহমান চট্টগ্রাম শহরের লালদিঘী ময়দানে ছয়দফা ঘোষণা করেন। তখনকার পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ূব খাঁনের উসকানীতে তৎকালীন পাকিস্তানের স্পীকার চট্টগ্রামের ফজলুল কাদের চৌধুরীর লাটিয়াল বাহিনীকে শক্ত হাতে ছাত্রলীগ ও চট্টগ্রামের জনগন এম এ আজিজের নেতৃত্বে প্রতিরোধ প্রতিহত করার বিষয়টিও বিস্ময়কর বটে।তখন থেকেই ছয় দফার মাঝে স্বাধীন বাংলাদেশের ভ্রুণ আবিস্কারের বিষয়টি নিউক্লিয়াসের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যাপক অবদানের বিষয়টি স্বীকৃত।

গন অভ্যূত্থানকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ নেতৃত্ব ব্যাপকভাবে বিকশিত হতে থাকে।আ স ম আবদুর রব ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক হিসাবে ইতিমধ্যেই ছাত্রসমাজে ব্যাপক জনপ্রিয়তার শীর্ষে।নূরে আলম সিদ্দিকীর দরাজকন্ঠের পদ্মা মেঘনা যমুনার খরস্রোতা ঢেউয়ের মত অসাধারণ বাগ্নীতায় কাব্যময় বক্তৃতা ও ছাত্রনেতাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী কারানির্যাতনভোগী হিসাবে সারাদেশের ছাত্রসমাজের কাছে ব্যাপক গ্রহনযোগ্যতার বিষয়টি সর্বত্র পরিলক্ষন করার মতো ছিলো। অন্যদিকে শাজাহান সিরাজের সাংগঠনিক দক্ষতা ও সমন্বয়ক তথা দুই বিরোধী ধারার মাঝে সহাবস্থান এবং অমায়িক ও সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলের সাথে সংশ্লিষ্টতা সহ সকলের সাথে মধুর ব্যবহারের অনন্য সংযোজন ছিল আবদুল কুদ্দুস মাখন।সকলেরই বক্তব্য রাখার আলাদা ঢং ও স্বকীয়তা ছিল।মাঠে ময়দানে সর্বত্র উপরোক্ত ছাত্রনেতা চতুষ্টয়কে দেখা যেতে থাকে।সারাদেশের ছাত্র সমাজের দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়।

ছাত্রলীগের কনভেনশনে ব্যাপক বিরোধিতার মুখেও ডেলিগেটদের ভোটে নূরে আলম সিদ্দিকী সভাপতি নির্বাচিত হন। শাজাহান সিরাজ সহজেই সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। উল্লেখ্য যে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে নিউক্লিয়াস জাতীয় ও তৃণমূল পর্যায়ে ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্রকে কেন্দ্র করে সাধারণ সম্পাদকের পদটি নিজেদের বলয়ে ধরে রাখতে সক্ষম ছিলেন। অতঃপর ডাকসূ নির্বাচন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে প্রথমবারের মত সরাসরি নির্বাচন।দেশব্যাপী ব্যাপক জল্পনা কল্পনার মধ্যেই দুই ধারার সমন্বয়ে যথাক্রমে নিউক্লিয়াস ধারার আ স ম আবদুর রব ভি পি ও শেখ ফজলুল হক মনি ধারার আবদুল কুদ্দুস মাখন যথাক্রমে জি এস মনোনীত হন। অবশ্য মনোনয়নে সারাদেশের ছাত্রসমাজের ও সাধারন মানুষের ব্যাপক জনসমর্থনের বিষয়টিই ছিল মূখ্য। সিরাজুল আলম খানের ভাষায় নূরে আলম সিদ্দিকীর অসাধারণ বাগ্নীতা,কাব্যময় দরাজ কন্ঠ,আ স ম রবের সাহস ও ভরাট গলা,মানুষকে কাছে টানার দক্ষতা, আন্দোলনে সংগ্রামে সাধারনকে আবেগতাড়িত ও উদ্বেলিত করার ক্ষমতা,
শাজাহান সিরাজ ও আবদুল কুদ্দুস মাখনের সাংগঠনিক দক্ষতা ও সাধারনের মাঝে সহজেই মিশে গিয়ে সাধারন ছাত্রছাত্রী সহ যে কাউকে কাছে টানার ক্ষমতা সব মিলিয়ে এই চতুষ্টয়ের মধ্য দিয়ে হাজার বছরের স্বপ্নকে স্বার্থক করে তোলার বিষয়ে নিউক্লিয়াসকে তিনি একমত করাতে পেরেছিলেন। কৌশলে শেখ ফজলুল হক মনি ও তোফায়েল আহমেদকে একই কাতারে সামিল করানোর বিষয়টি অনেকের লেখায় বুঝতে পারার মতো।অনুভব ও অনুধাবন করার মতো।

জানা যায় যে, তোফায়েল আহমেদকে ডাকসূ ভি পি হিসাবে নির্বাচিত করার পরপরই সিরাজুল আলম খান শেখ মুজিবুর রহমানের (তখনও বঙ্গবন্ধু হননি)কাছে নিয়ে যান।তারও আগে ধানমন্ডির মাঠে তোফায়েল আহমেদকে বক্তৃতার নানা বিষয়ে সিরাজুল আলম খান কর্তৃক পাঠদানের বিষয়টি নানাজনের লেখায় দেখা যায়। নূরে আলম সিদ্দিকীর মতে জাসদ গঠনের আগে ও পরে বঙ্গবন্ধুর সাথে সিরাজুল আলম খানের সম্পর্ক অটুট ছিলো।তবে তোফায়েল আহমেদ পরবর্তিতে শেখ ফজলুল হক মনি ধারার সাথে গাঁটছড়ার বন্ধনে জডিয়ে পড়েন। মতবিরোধ স্বত্ত্বেও তোফায়েল আহমেদ বিভিন্ন টকশো’তে সিরাজুল আলম খানকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন।নূরে আলম সিদ্দিকী প্রকাশ্যে প্রথম থেকেই সিরাজুল আলম খানের আদর্শের বিরুদ্ধে উচ্চকন্ঠ থাকলেও সিরাজুল আলম খানকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন। আমাদের স্মরণ রাখতে হবে যে, উল্লেখিত সকলেই একজন বঙ্গবন্ধু তৈরীতে, রাজনৈতিক কাল্ট তথা একক জাতীয় নেতা হিসাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতীয়ভাবে প্রতিষ্টিত করার জন্য অহর্নিশি হাঁডভাঙ্গা পরিশ্রমের বিষয়টিও সর্বজনবিদিত বটে।বেগম ফজিলতুন্নেছা মুজিবের সাথে উল্লেখিত সকলের যোগাযোগ ও চমৎকার সম্পর্ক ছিলো। বঙ্গবন্ধুকে সকলেই ‘লীডার’বলে সম্বোধন করতেন।

অবশেষে ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচন। আলাদা আলাদা ভাবে আ স ম আবদুর রব, আবদুল কুদ্দুস মাখন, নূরে আলম সিদ্দিকী,শাজাহান সিরাজ উল্কার বেগে সারাদেশে আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করার জন্য চষে বেড়াচ্ছেন।উদাত্ত আহব্বান জানাচ্ছেন। বঙ্গবন্ধুও আওয়ামী সারথীদের নিয়ে সারাদেশে আলোড়ন তৈরীতে সক্ষম হয়েছেন। সারাদেশের জনগনের হৃদয়ের মনিকোটায় ও প্রকাশ্যে ধীরে ধীরে চার খলিফার নাম উচ্চারিত হতে থাকে। সদ্যভূমিষ্ট অনেক সন্তানের নাম চার খলিফার নামের সাথে মিল রেখে রাখতে দেখা যায়। পত্রপত্রিকায় একদিকে বঙ্গবন্ধুর নাম অন্যদিকে চার খলিফার মাধ্যমে উত্তাল জনসমুদ্র আর জ্বালাময়ী ভাষনের বিষয়টি মূখ্য হয়ে দাঁড়ায়। কখনো কখনো তোফায়েল আহমেদ, তাজউদ্দিন আহমেদ (আলীগের সাধারন সম্পাদক অবশ্য তখনও যুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী হননি) ও চট্টগ্রামের এম এ আজিজের নাম মাঝে মাঝে শুনা যেতো। বঙ্গবন্ধু ও চার খলিফার নামের আড়ালে সবই একাকার তখন। তখনকার জীবিত যে কাউকে জিজ্ঞ্যেস করলে সহজেই সত্যতা মিলবে।
আওয়ামী লীগ পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদে ভূমিধ্বস বিজয় অর্জন করে।গত কয়েকযুগের ব্যবধানে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মানুষ ১৯৭০ সালের নির্বাচনকে জনগনের দ্বারা জনগন কর্তৃক সত্যিকার অর্থে সবচেয়ে শ্রেষ্ট নির্বাচন বলে লোকমূখে ব্যাপক জনশ্রুতি এখনও দেখা যায়।

চতুর্দিকে আওয়ামী লীগের ভূমিধ্বস বিজয়ের জয়ধ্বনি ও জয়জয়াকার। বিজয় আওয়ামী লীগের হলেও জাতীয় ও তৃণমূলের ছাত্রলীগ নেতা ও কর্মীরা জনগনের ভালবাসার তুঙ্গে।ছাত্রলীগ নেতা ও কর্মীরা জনগনের মমতায় আপ্লুত ও উদ্দীপ্ত। গ্রামে গন্জে চায়ের দোকানে সর্বত্র বঙ্গবন্ধু এবং চার খলিফার নামে নানা কল্পকাহিনী।

অবশেষে পশ্চিম পাকিস্তানের ভূট্টোসহ সামরিক কর্তাদের চক্রান্তে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় না বসানোর জন্য তালবাহানা শুরু করে।নিউক্লিয়াস ও ছাত্রলীগ নেতৃত্ব ততদিনে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিকল্প যে নেই-তা অনুধাবনে সক্ষম হয়। ছাত্রলীগের প্রস্তুতিগ্রহন প্রক্রিয়া আগে থেকে চলমান ছিল বিধায় প্রস্তুতি গ্রহনে তেমন সময় লাগেনি।৭০’য়ের নির্বাচনী প্রচারনায় স্বাধীনতা অর্জনের স্বপক্ষে কখনো গোপনে কখনো কৌশলে কথামালার ফুলঝুরি দিয়ে জনমত ও জনসচেতনতা গড়ে তুলতে চার খলিফার অবদানের বিষয়টির জনশ্রুতি এখনও বহমান।

পাকিস্তান সামরিক সরকার প্রধান ইয়াহিয়া খান ১’মার্চ,১৯৭১ সালে নানা তালবাহানা ও সময় ক্ষেপণের পর অবশেষে পার্লামেন্ট অনির্দ্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ ঘোষনা করলে সারাদেশ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ দেশের সকল শিক্ষাঙ্গন ও ইন্ডাষ্ট্রিয়াল এরিয়া আগ্নেয়গিরির মত উত্তপ্ত হয়ে উঠে। ছাত্র শ্রমিক ও জনগনের প্রচন্ড চাপে চারখলিফার নেতৃত্বে ১৯৭১’সালের ১’লা মার্চ রাতে লক্ষ জনতাকে সাক্ষী রেখে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়।পরদিন নিউক্লিয়াসের পরামর্শক্রমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সামনে ছাত্র শ্রমিক ও সকল স্তরের জনসমাবেশের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়া হয়।

পরদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র শ্রমিক ও সাধারন জনগনের উপস্থিতিতে তিল ধরনের জায়গা কোথাও ছিলনা।সর্বত্র লোকে লোকারণ্য।ছাত্রনেতারা বাধ্য হয়ে কলাভবনের ছাদে অবস্থান নেন। চতুর্দিকে পাকিস্তান মিলিটারী কর্তৃক পরিবেষ্টিত। মেশিন গান ও রাইফেল কাঁধে পাক হায়েনা বাহিনী। আকাশে সশস্ত্র হেলিকপ্টার ঘূরছেতো ঘুরছেই। সেদিকে কারো ভ্রুক্ষেপ যেমন নেই তেমনি জীবন গেলেও কেউ সভাস্থল ছেড়ে না যাওয়ার প্রতিজ্ঞায় মুষ্টিবদ্ধ হাতে জ্বালাময়ী শ্লোগানের পর শ্লোগানে আকাশ বাতাস কেঁপে তুলতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেনি। অবশেষে চার খলিফার উপস্থিতিতে ডাকসূ ভি পি আ স ম আবদুর রব স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকা উত্তোলন ও চতুর্দিকে ঘূরিয়ে ঘূরিয়ে প্রদর্শন করলে শ্লোগানের পর শ্লোগানে আকাশ বাতাস বিদীর্ন হতে থাকে। চতুর্দিকে উপস্থিত ছাত্র শ্রমিক জনগনের চোখেমূখে আনন্দাশ্রু গড়িয়ে পড়ছে।পরদিন ৩’রা মার্চ পল্টনে সবাইকে উপস্থিত থাকতে বলা হয়। উল্কার বেগে সে খবর নারায়নগন্জ সহ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে।

পত্রপত্রিকা, সোশ্যাল মিডিয়া,বিজ্ঞজনদের ভাষায়-“২’রা মার্চে পতাকা উত্তোলন বিশেষতঃ আওয়ামী লীগের পাকিস্তানের সিংহাসনে আরোহনের স্বপ্নকে চিরদিনের জন্য পেরেক মারা হয়েছিলো॥”
অনেকে আবার বলেছেন যে, “খোদা না খাস্তা-বাংলাদেশ স্বাধীন না হলে চার খলিফার হাড্ডি মাংস খুঁজে পাওয়া যেতোনা।”

নূরে আলম সিদ্দিকীর সভাপতিত্বে ৩’মার্চ,১৯৭১। পল্টন ময়দান সরগরম।লক্ষ জনতার সমাবেশ। শ্লোগানের পর শ্লোগান। অবশেষে শাজাহান সিরাজ ইশতেহার পড়লেন। এরই মাঝে অনির্ধারিতভাবে বঙ্গবন্ধু পল্টন ময়দানের মন্চে আরোহন অত্যন্ত তাৎপর্য্যপূর্ণ ছিল বলে অনেকেই মনে করেন। বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতে ২য়বারের মত ইশতেহার পাঠ করলেন শাজাহান সিরাজ।স্বাধীন বাংলাদেশের আয়তন, স্বাধীনতার স্থপতি, পতাকা,জাতীয় সঙ্গীত সহ এমন কোন কিছু বাকী নেই যা ইশতেহারে ছিলনা। স্মরণ রাখতে হবে যে,ইশতেহার শব্দের অর্থ প্রক্লেমেশন বা ঘোষনা। বঙ্গবন্ধু ও লক্ষ জনতার উপস্থিতি, অনুমোদনের বিষয়টি সকলেই জানে। তারপরেও ঘোষনা নিয়ে বাগাড়ম্বরের কারন আছে কি? স্বাধীনতা অর্জনের পর কোন সরকারই ইশতেহারের বিষয়ে স্পষ্ট করে কোন কিছু বলেছেন কি? বঙ্গবন্ধুর নামে জিয়ার ঘোষনাপাঠ বাঙালী ইপিআর পুলিশ ও সেনাবাহিনীকে উদ্দীপ্ত করেছিলো-এই সরল সত্যটুকু স্বীকার করতে দ্বিধান্বিত হওয়ার অবকাশ নেই।আওলিয়া হওয়ার দরকার আছে কি?তখনকার প্রেক্ষাপটে জিয়াউর রহমান অপরিচিত ছিলেন।তিনি একজন সাধারন মেঝর থেকে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার ছিলেন এটিও ঐতিহাসিক সত্য। ১৯৭৪ সালে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় লেখা নিবন্ধে জিয়াউর রহমান নিজেকে কখনও ঘোষক বলেননি। মুক্তিযুদ্ধ আর্কাইভে তা জমা থাকার কথা। তিনি বাকশালের সদস্য হওয়ার জন্য আবেদন জানানোর কথা কাউকে বলতে দেখা যায়না।নিম্নে পত্রিকায় প্রকাশিত ১৯৭১ সালের ৪’মার্চ প্রকাশিত ইশতেহার ও অথেনথিক ছবি দেখেই বুঝতে পারা যায় যে, এসব ছবি হাজার বছরের কথা বলে।উল্লেখ্য যে ৩’রা মার্চ পল্টন ময়দান থেকেই ৭’ই মার্চে রেসকোর্স ময়দানে জনসভার ঘোষনা দেন বঙ্গবন্ধু।

ঐতিহাসিক ৭’ই মার্চ। রেসকোর্স ময়দান।সকাল থেকেই চার খলিফার কড়া নিরাপত্তা ও নেতৃত্বে সুললিত ভরাট কিংবা দরাজ কন্ঠে মন্চ ও রেসকোর্স ময়দানের জনসভারস্থল সরগরম। নিরাপত্তার চাদরে মন্চ ও জনসভার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ সহ ঢাকা শহরের বেশীর ভাগ স্কুল কলেজের অসংখ্য ছাত্রছাত্রীরা ভলান্টিয়ার হিসাবে দায়িত্বরত।অতঃপর নেতা এলেন। ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ট ভাষণ দিলেন। বাঙালীর হৃদয় জয় করলেন।”এবারের সংগ্রাম-মুক্তির সংগ্রাম।এবারের সংগ্রাম-স্বাধীনতার সংগ্রাম॥” আ স ম আবদুর রব বলেছেন-বঙ্গবন্ধুর ৭’ই মার্চের ভাষণ আব্রাহাম লিংকনের গেটিসবার্গের ভাষণের সাথে তুলনীয়।

অতঃপর এলো ২৩’শে মার্চ। পাকিস্তান দিবসের পরিবর্তে প্রতিরোধ দিবস।ঐদিন সারাদেশে পাকিস্তানী পতাকার পরিবর্তে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলিত হয়।কেবলমাত্র ঢাকা ক্যান্টনম্যান্ট ব্যতিত।ঢাকায় পল্টন ময়দানে চারখলিফাকে আনুষ্ঠানিকভাবে জয়বাংলা বাহিনী ও মহিলা জয়বাংলা বাহিনী গার্ড অব অনার প্রদান করেন।ঐদিন বাংলাদেশের হারকিউলিস খ্যাত কামরুল আলম খান খসরু রাইফেল উঁচিয়ে উপরের দিকে গুলি ছুঁড়ে স্বাধীনতা আন্দোলনকে মুক্তিযুদ্ধে রূপান্তরের সূচনা করেন। জয়বাংলা বাহিনীর ব্যান্ডের তালে তালে পতাকা উত্তোলন করেন হাসানুল হক ইনু। উল্লেখ্য যে,জয়বাংলা বাহিনীর অধিনায়ক ও উপ অধিনায়ক যথাক্রমে আ স ম আবদুর রব ও কামরুল আলম খান খসরু।

ঐদিন আমেরিকার এবিসি টেলিভিশনের বিশ্ববিখ্যাত সাংবাদিক টেড কপেল ভিডিওতে সব ধারন করেন এবং ২৬’শে মার্চ ১৯৭১’য়ে তা প্রচারিত হয় বিশ্বসংবাদে। ইউটিউব এবং নিম্নে প্রদত্ত লিংকে তা দেখা যেতে পারে।গার্ড অব অনার শেষে চার খলিফার নেতৃত্বে বিশাল মিছিলের বহর নিয়ে ৩২ নম্বরের বঙ্গবন্ধুর বাসায় গমন করেন।ছবিতে আ স ম আবদুর রবের হাত থেকে স্বাধীন বাংলার পতাকা গ্রহন করে বঙ্গবন্ধুকে পতাকাটি চতুর্দিকে দোলাতে দেখা যায়।

এলো বাঙালী জাতির ইতিহাসের জঘন্যতম কালোরাত।শুরু হলো পাক হায়েনা বাহিনীর পৈশাচিক উল্লাস। অপারেশন সার্চ লাইটের নামে বর্বরোচিত গনহত্যা।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়,রাজারবাগ পুলিশ লাইন সহ ঢাকার সর্বত্র আগুনের লেলিহান শিখা ও সর্বত্র হায়েনার গুলিতে জর্জরিত।ট্যাংকের চাকায় পিষ্ট। কোলের শিশু,ছোট ছোট সন্তান, নারী পুরুষ বৃদ্ধ,যুবক কেউই রেহাই পাইনি। এরই মাঝে বঙ্গবন্ধুকে বন্দি করে পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে নিক্ষেপ করার প্রক্রিয়া শেষ। আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তিযুদ্ধ শুরু সারাদেশে তথা ঢাকা,চট্টগ্রাম,খুলনা ও রাজশাহী সর্বত্র আক্রমন-পাল্টা আক্রমন।

মুক্তিযুদ্ধে চার খলিফার ব্যাপক কর্মকান্ডও অবিস্মরণীয়। সে কাহিনী অন্যসময় অন্যকেউ লিখবে বা ইতিমধ্যেই রচিত হতেও পারে।১৬’ই ডিসেম্বর বিজয়ের দিনেই আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বে ঢাকা রেডিও ষ্টেশন দখল করে ‘বাংলাদেশ বেতার’ নামে আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার কথা জানা যায়।পরবর্তিতে যুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের বিশেষ অনুরূধে চার খলিফা সমগ্র দেশ ও জাতিকে বঙ্গবন্ধু দেশে না ফেরা পর্যন্ত ঐক্যবদ্ধ থাকার জন্য দেশবাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্ববান জানাতেন।চার খলিফার তেলেসমাতি তথা বিশ্বাসযোগ্যতা এত বেশী ছিল যে, জনগন অক্ষরে অক্ষরে তা পালন করতেন। লোকে বলে বঙ্গবন্ধু দেশে ১০’ই জানুয়ারী’১৯৭২ সাল।না ফেরা অবধি চুরি,ডাকাতি,ধর্ষণ,স্মাগলিং,দূর্ণীতি,খূন বা গুমের কোন ইতিহাস নেই। তখন সারাদেশ মুক্তিযুদ্ধ ফেরত ছাত্রলীগনেতা ও কর্মী,অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধা তরুন তুর্কিদের নিয়ন্ত্রনে কঠোর নিরাপত্তায় সদ্য স্বাধীন দেশ পরিবেষ্টিত ছিল।সেই দিনগুলোতে স্বাধীনতার প্রকৃত স্বাদ বলতে কি বুঝায়- সেই সময়ের প্রজন্মের মূখে এখনো তা শুনা যায়॥

নূরে আলম সিদ্দিকী সহ চার খলিফার তিন খলিফা প্রয়াত। অনন্তলোকে মিশে আছেন। প্রথমে আবদুল কুদ্দুস মাখন ভাই অকালে পাড়ি জমিয়েছেন।অর্থের অভাবে যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসা শেষ করতে পারেননি। উনার পবিত্র দেহ বাংলাদেশে নিয়ে যেতে অনেক কাঠখড় পোড়ানোর নাটক অনেকেই জানার কথা। অবশেষে দেশের মাটিতে দাফন কাফন।শাজাহান সিরাজ ভাই দীর্ঘদিন রোগে ভোগে অবশেষে সকলের মায়া ত্যাগ করে পরপারে গমন করেছেন। এখন নূরে আলম সিদ্দিকী ভাইয়েরও জীবনাবসান। তিন তিনটি কিংবদন্তি নক্ষত্র এখন অনন্তলোকে। একসময়ের সবচাইতে উজ্জ্বল নক্ষত্রটি এখনও টিমটিম করে জ্বলছে।তিনি আ স ম আবদুর রব।১৯৭২’সাল থেকে এখনও ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক চরিত্র হননের শিকার।’জন্মিলে মরিতে হইবে।’ তিনিও একদিন আমাদের মায়া ত্যাগ করে চলে যাবেন।মহান সৃষ্টিকর্তা উনাকে আরও দীর্ঘজীবন দান করুন। অন্ততঃ গনতান্ত্রিক আচরনের সমৃদ্ধির জন্য নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রানিত করতে রব ভাইয়ের প্রয়োজন আছে বলে অনেক বিজ্ঞজনের লেখা ও সোশ্যাল মিডিয়াতে বলতে লিখতে দেখা যায়।

পৃথিবীর সব দেশে স্বাধীনতা বা বিজয় অর্জনের পর আন্দোলন সংগ্রামের নেতাগনের মধ্যে বিভেদ অবশ্যাম্ভাবী হয়ে উঠে।ব্যক্তিগত অবিশ্বাস,ক্ষোভ,অভিমান কিংবা আদর্শগত কারনে বিভেদ বিচ্ছেদ হলেও ইতিহাসের সামগ্রিক মূল্যায়ন থেকে পৃথিবীর কোন দেশে তাঁদের বন্চিত করা হয়নি। বাংলাদেশে তার উল্টোটা বিস্ময়কর বটে! ১৯৭৫ পরবর্তি সময় থেকে এখনও বাংলাদেশের ইতিহাসের ও ঐতিহাসিক চরিত্রের মূল্যায়নে ম্যানিপুলেশন অসহনীয় বলে লোকমূখে বলতে শুনতে পাওয়া যায়। যখন যারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকে তারা তাদের মত করে ইতিহাস সাজানোতে তৎপর বলে বিভিন্ন লেখা ও টকশো’তে দেখা যায়।বিজ্ঞজনদের কথা বাদই দিলাম।সোশ্যাল মিডিয়া ও লোকমূখে তা সবসময় শুনতে বা বলতে দেখা যায়। যাই হোক চার খলিফার ক্ষেত্রেও অন্যথা হয়নি।

আদর্শগত কারনে নূরে আলম সিদ্দিকী ও আবদুল কুদ্দুস মাখন একদিকে। আ স ম আবদুর রব ও শাজাহান সিরাজ অন্যদিকে।তবে অত্যন্ত আশ্চর্য্যের বিষয় এই যে, গত কয়েকযুগের ব্যবধানে পদ্মা মেঘনা যমুনার জল যতই গড়িয়ে যাকনা কেনো-উনাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সম্পর্ক ছিলো অনেক মধুর। নূরে আলম সিদ্দিকী ভাই ও শাজাহান সিরাজ ভাইয়ের মূখে চারজনকে কোন না কোনদিন আগামীর সন্তানেরা একত্রে সমাধিস্থ করার স্বপ্ন দেখতেন। তবে এটা ঠিক যে, শত বছর পরে হলেও চার খলিফা এভারেষ্ট শৃঙ্গের নীচে হিমালয়ের পর্বতমালা হিসাবে বিবেচিত হবেন। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি যতদিন থাকবে ততদিন চার খলিফার নাম মূছে দিতে কেউই সক্ষম হবেননা।আগামীর ঐতিহাসিকরা, সন্তানগন তা হতে দেবেনা।

খূবই দূঃখের সাথে বলতে হয় বাংলাদেশের কোন দৈনিক আবদুল কুদ্দুস মাখন,শাজাহান সিরাজ, নূরে আলম সিদ্দিকীর মৃত্যুতে বড় আকারে তেমন কোন সংবাদ ছাপিয়েছে বলে মনে হয়না। রেডিও টেলিভিশনেও দায়সারা গোছের মত প্রতিবেদন।মানবজমিন নামক সংবাদপত্রটি কিছুটা বড় করে ছাপিয়েছে।যুগান্তর ও সমকাল আ স ম আবদুর রবের বিবৃতিকে হাইলাইট করলেও জাতীয় পত্রিকারগুলো দায়সারাভাবে সাদামাটা প্রতিবেদন বা বিবৃতি প্রকাশ করেছেন।

সমকাল ও যুগান্তর পত্রিকায় আ স ম আবদুর রবের লেখাটি সবচেয়ে তাৎপর্য্যপূর্ণ বলে অনেকে মনে করেন।কবি,সাহিত্যিক,সাংবাদিক জগৎ থেকে শুরু করে সকলেই তস্কর,চামচামি করে রাতারাতি আলাদিনের চেরাগ হাসিলে ব্যস্ত।বর্তমানের আর আগামীর সন্তানদের নিকট দায়বদ্ধতা বলে কোথাও কোনকিছু নেই। উদার ও মহৎ শব্দটি এখন যাদুঘরে। সমকাল ডাঃ জাফরউল্লাহ চৌধূরীকে সম্মান জানিয়ে যে উদাহরণ দেখিয়েছে-অন্যদের মধ্যে সে উৎসাহ বা সাড়া দেখা দেবে কি? চার খলিফা বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন এবং তা মুক্তিযুদ্ধে রূপান্তরের নায়ক। ইতিহাসের কষ্টিপাথরে যা ঐতিহাসিক আকর।যা ঘটছে, যা দেখছি,আগামী জমানার সন্তানেরা আমাদের দায়বদ্ধতা থেকে মুক্তি দেয়ার কথা নয়! তবে সমুদ্র মন্থন করে ইতিহাসের অমৃত কষ্টিপাথরের লেখা আগামীর প্রজন্ম তুলে আনবেই। আশাবাদের বিকল্প নেই।

৩১’শে মার্চ,২০২৩
যুক্তরাষ্ট্র

তথ্যসূত্রঃ
গুগল, উইকিপিডিয়া, ম্যাগাজিনস, মুক্তিযুদ্ধ আর্কাইভভূক্ত বই, সোশ্যাল মিডিয়া, টক’শো,পত্রপত্রিকা ইত্যাদি।
ছবি ও কৃতজ্ঞতাঃ গুগল,রশিদ তালুকদার,সুমন মাহমুদ,লিনু হক,মহিউদ্দিন আহমদ,মোহাম্মদ ইলিয়াছ মিয়া

লেখক সাবেক প্রথিতযশা ছাত্রনেতা, সাবেক সাধারণ সম্পাদক-কমিটি ফর ডেমোক্রেসী ইন বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্র ,সাবেক সদস্য সচিব-মুক্তিযুদ্ধ চেতনা পরিষদ, যুক্তরাষ্ট্র, সাবেক প্রতিষ্ঠাতা আহ্ববায়ক-কর্ণেল তাহের স্মৃতি সংসদ, যুক্তরাষ্ট্র,অন্যতম সমন্বয়ক-কানেক্ট বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল, উপদেষ্টা- জে এস ডি কেন্দ্রীয় কমিটি, বাংলাদেশ ।